শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা এবং লেখালেখি

॥ জাফর ওয়াজেদ ॥ / ৬৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড়ো অধ্যায় বঙ্গবন্ধু। পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক জান্তা ও নির্বাচিত শাসকরা তাঁর নামোচ্চারণ নিষিদ্ধ করেছিল। ইতিহাসসহ সব স্থাপনা থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল তাঁর নাম। কিন্তু তা বেশি দিন সম্ভব হয়নি। স্বমহিমায় সব দুর্ভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে তিনি আলোকিত হয়ে উঠছেন ক্রমাগত। কেউ তাঁকে দাবায়ে রাখতে পারেনি। তিনি জেগে উঠছেন বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের পথ ধরে।

 

বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে দিয়েছেন বিশালত্ব; কিন্তু বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন গুলি আর রক্ত। তারপরও মৃত্যুহীন প্রাণ হয়ে তিনি জেগে আছেন বাঙালির হৃদয় ও মনে। তাঁর কর্ম ও কীর্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের পরিণতি এবং আগামী জীবনের অনন্ত সময়ের বিবর্তন। অথচ আগামী প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার মৌলিক দায়িত্ব পালন করছেন না কেউ।

 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যতটুকু কাজ হচ্ছে তা গোছানো নয় এবং প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এ কাজে এগিয়ে আসেনি। তারা নিজ উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো কাজে আগ্রহী হয়নি। যদিও বঙ্গবন্ধুর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে চেয়ার স্থাপন করা হয়েছে, ছাত্রাবাসের নামকরণ হয়েছে। এমনকি দেশে বহু স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামে। বঙ্গবন্ধু কেবলই সেতু, ছাত্রাবাস, সড়ক, ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে আছেন। কিন্তু এসব ছাপিয়ে তিনি তো পুরো বাংলাদেশ। এ দেশের প্রতিটি ইঞ্চির প্রতিটি ধূলিকণার মাঝে তিনি মিশে আছেন। বাংলাদেশের পতাকায় ভেসে আসে তাঁর মুখ। মানচিত্রজুড়েও তিনি। তাঁকে কোনো কিছুতেই সীমাবদ্ধ করে রাখা যায় না।

 

 

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন আজও হয়নি। যেমন হয়নি বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক জীবন ও কর্মধারা, তাঁর দর্শন, মতবাদ, দেশ শাসন নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ বা গবেষণা। তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচির রাজনৈতিক অধ্যায় নিয়ে বহু সমালোচনা হলেও এর অর্থনৈতিক, সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে ন্যূনতম আলোচনা বা সমালোচনা কোনোটাই হয়নি। তাঁর এই দর্শন অনালোচিতই রয়ে গেল। তাঁর সহকর্মী, অনুসারী- কেউই এ বিষয়ে আলোকপাত করতে এগিয়ে আসেননি। বরং বিরুদ্ধবাদীদের সমালোচনার শিকার হতে পারেন- এই ভয়ে নীরবই রয়ে গেছেন। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি নিয়ে কোনো গুরুত্ববহ গবেষণা হয়নি। কেবল বঙ্গবন্ধুর এক আত্মীয় ডক্টর সেলিমুজ্জামান বাকশাল নিয়ে পিএইচডি করেছেন বিদেশি এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেই গবেষণাও এদেশে অপ্রকাশিত থেকে গেছে।

 

 

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে বাজারে বহু বই পাওয়া যায়। অধিকাংশ লেখকই অজ্ঞাতকুলশীল। সেসব লেখায় বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায়, তা চর্বিত চর্বণ। মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ কিছুই নেই। এক বই থেকে যেন শত বই লেখা হয়েছে। সন, তারিখ, কর্মসূচি অভ্রান্ত নয়। এসব গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যায় না। অনেক বই পাঠে মনে হয়েছে, এগুলো বাতিল করা উচিত। যারা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহচর, তারা স্মৃতিচারণ লিখতেও এগিয়ে আসেননি। তাঁর হাতে গড়া রাজনীতিকরাও এক্ষেত্রে কৃপণতাই দেখিয়ে এসেছেন। যদি লিখতেন তারা, তবে বঙ্গবন্ধু ও সমকালীন ইতিহাসের অনেক তথ্যই পাওয়া যেত। আর তা যায়নি বলেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে মিথ্যাচার, নিন্দামন্দ বেশি হয়েছে। অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন তিনি সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেসব ছাপিয়ে তিনি বেরিয়ে এসেছেন আলোকিত মানুষ হিসেবেই।

 

 

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও তাঁর কর্মময় ঘটনাবলির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পেতে হলে আগামী দিনে আশ্রয় নিতে হবে অশেষ কষ্টকর গবেষণার ওপর। তাতেও হয়তো পরিপূর্ণতা অর্জন করা যাবে না এ বিষয়ে। কারণ তত দিনে তথ্য ও সূত্রের অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলবে তার অবিকল অবয়ব। যেমন হারিয়ে গেছেন তাঁর সহকর্মী, সহযোগীরা। যথাসময়ে কাজ করা গেলে অনেক উজ্জ্বল দিক পাওয়া যেত। যারা তাঁর সাহচর্য পেয়েছেন সেই অনুসারীরাও নির্বিকার।

 

 

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা-পূর্বাপর সময়ে তাঁর সহকর্মী, জেলা নেতা, ভক্ত, অনুরাগীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের কাছে চিঠি লিখতেন। সেসব চিঠিপত্র উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নামে সহস্র সংগঠন রয়েছে, যারা জন্ম ও শোক দিবস পালনেই নিজেদের সীমিত রেখেছে। এর বাইরে অন্য কোনো কাজে তারা সম্পৃক্ত নন। ‘ওরাল হিস্ট্রির’ যুগে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে যারা এসেছিলেন, তাদের ভাষ্য গ্রহণেও কারও পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অথচ গণমানুষের ভাষ্য নিয়ে ইতিহাস লেখা হলে বাঙালি পেত তাদের মুক্তিদাতার বিশালত্বকে, যা অনুপ্রাণিত করত আগামীর পথযাত্রায়। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের সঠিক সংরক্ষণের প্রচেষ্টা আজও অনুপস্থিত। তার সহকর্মী, সংগঠন, ব্যক্তির পক্ষ থেকে তেমন উদ্যোগ গ্রহণ সুদূরপরাহত। ফলে, তাঁকে কেন্দ্র করে বায়বীয় ও কল্পনামিশ্রিত উপন্যাসও লেখা হয়েছে। যাতে শেখ মুজিব যথাযথভাবে উঠে আসেননি। বঙ্গবন্ধু রচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং প্রকাশিতব্য আরও কয়েকটি গ্রন্থে দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা মানবকে পাওয়া যাবে। কিন্তু তাঁর সময়কাল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিকতার স্বার্থে গবেষণা যে জরুরি, তা কারও উপলব্ধিতে আসে না। বরং বঙ্গবন্ধুর ছবি ক্ষুদ্রাকারে বিলবোর্ডে ছাপিয়ে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বঙ্গবন্ধুর ওপর অসম্পূর্ণ বা বৈরী আলোচনা ও মিথ্যাচারে ভরা সমালোচনাপূর্ণ প্রকাশনা দিয়ে ব্যবসায়িক ফন্দিফিকির আজও চলছে। তেমনি তাঁর নামে ধান্দাবাজির অজস্র সংগঠনও গড়েছেন কেউ কেউ। কিন্তু তাঁর জীবন ও কর্মের সঠিক উপস্থাপনার কাজটি কেউ করছেন না। ব্যক্তি উদ্যোগে তাঁর কর্মময় জীবনের ঘটনাবলিও বিভিন্ন কর্মকা-ে সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহও প্রায় অসম্ভব।
শেখ মুজিব সম্পর্কিত বিদ্বজ্জনদের অপপ্রচারের বিপরীতে কিছুই লেখা হয়নি। অথচ এসব অপপ্রচার জনমানসে গ্রোথিত করা হয়েছে এমনভাবে যে, অনেক বাঙালি মনে করে, শেখ মুজিব পাকিস্তান নামের ইসলামি রাষ্ট্রটি ভেঙেছেন জাতীয় অসত্য কথা। শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নন, নন কোনো ছাত্রাবাস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তিনি মূলত সমগ্র বাংলাদেশ। এই বাঙালির আদর্শ আসলে কী, তা জানা না গেলে সবই ধুলায় হবে লীন। বাঙালি হারাবে তার স্বাধীনতার সুফল।

 

 

তবে, আশার কথা হলো, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। এ নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছে। জাতীয় এই কমিটির কর্মকা-ে শ্রেষ্ঠ বাঙালির জীবন ও কর্মের প্রকৃত চিত্র নানা আঙ্গিকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করা যায়, এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একজন আদর্শিক বাঙালি ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক হয়ে গড়ে ওঠার পাথেয় খুঁজে পাবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের আলোকে এগিয়ে যাবে দেশ, তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত হবে আগামী প্রজন্ম। এর কোনো বিকল্প নেই।

 

 

লেখক: মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।


এ জাতীয় আরো খবর ....

Archives

MonTueWedThuFriSatSun
   1234
262728293031 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
31      
এক ক্লিকে বিভাগের খবর