শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ১২:১১ পূর্বাহ্ন

কিশোর গ্যাং কুষ্টিয়া শহরের এক আতঙ্কের নাম!

শাহীন আলম লিটন / ২৪৫ বার নিউজটি পড়া হয়েছে
আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০, ১১:০৪ পূর্বাহ্ন

কিশোর গ্যাং কুষ্টিয়া শহরের এখন এক আতঙ্ক নাম। একের পর এক শহরের নিজেদের দলের ক্ষমতা ও দাপট দেখাতে মরিয়া তারা। বর্তমানে কিশোর গ্যাং গুলোর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে মুঠোফোন ও ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে যোগাযোগ করছেন। সেই সাথে স্মাট ফোনে গেমস এর মাধ্যমেও তারা গ্রুপিং সৃষ্টি করে দলীয় সদস্য বৃদ্ধি করছে। দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে লেখাপড়া থেকে অমনোযোগী হয়ে স্মাট ফোন ও এসব গ্রুপিং এ জড়িয়ে যাচ্ছে কিশোররা। এতে তাদের ভবিষ্যত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা।

সেই সাথে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এসব কিশোর গ্যাং গুলো কতটা বিস্তার করেছে। কিশোর গ্যাং, নেশা এবং চুরি ডাকাতি সব একই সুত্রে গাথা। সন্ধ্যার পর থেকেই এইসব অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। ইদানিং স্মাট ফোনের গেম এবং ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমেও কিশোররা অপরাধে জড়ানোর প্রবনতা দেখাচ্ছে। সেই সাথে কুষ্টিয়ার শেখ রাসেল হরিপুর-কুষ্টিয়া সংযোগ সেতুসহ শহরের গুরুত্বপূর্ন জনসমাগম স্থান গুলো একাধিক কিশোন গ্যাং তাদের সদস্যদের নিয়ে বেপরোয়া মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে জানান দেয়। এতে সাধারন পথচারী ও জনমনে এক আতঙ্ক সৃষ্টি করে তারা।

সম্পতি (১৮ নভেম্বর) বুধবার বিকেলে কুষ্টিয়া শহরে কিশোর গ্যাং এর মধ্যে আধিপত্ত্য বিস্তার এর জের ধরে কুষ্টিয়া কালেক্টর স্কুলের ৮ম শ্রেণির লাবিব আলমাস নামের স্কুল শিক্ষার্থীকে বাসা থেকে ডেকে এনে মারধর করে অপর গ্যাং এর লোকজন। মারধরের প্রমান এবং তাদের শক্তি জাহির করতে মারার ঘটনাটি ভিডিও করে ফেসবুকে ও গ্রুপে ছাড়ায়। ভিডিওতে তাদের কথোপকথোনেও উঠে আসে কুষ্টিয়ার কিশোর গ্যাংদের বিচরণের দৃশ্য।

(১২ নভেম্বর) বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়ার আলোচীত কিশোর গ্যাং এস কে সজিব, সিয়াম ও নিবিরদের সাথে দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রকাশ্যে ইসলামীয়া কলেজ গেটে ছুরিকাঘাত করে কুষ্টিয়া মজমপুর এলাকার মোহাম্মদ শেখের ছেলে হৃদয় হোসেনকে। হৃদয় বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং “নিবির ও সিয়াম” গ্রুপের সিয়াম (১৭), ইফতি (১৬), অভি (১৬) নামের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

(০৩ জুলাই) শুক্রবার কুষ্টিয়া শহরের থানা পাড়া পুলিশ ক্লাব সংলগ্ন মাঠের ফুটবল খেলার সময় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি হয় কিশোর তরিকুল ইসলাম ও মিনারুল ইসলামের। এক পর্যায়ে মিনারুল তার পকেটে থাকা ছুরি বের করে তরিকুলের শরীরে উপর্যপুরি আঘাত করলে মারা যায় তরিকুল।

(১৪ জানুযারি) রোববার আগুন তাপানোকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার চৌড়হাস এলাকায় শামীমের সাথে সোহানের কথা কাটাকাটি হয়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সোহানের বন্ধু আসিফ কোমর থেকে ছুরি বের করে শামীমকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। শামীম ও পাল্টা সোহানকে ছুরিকাঘাত করে। এ ঘটনায় তাদের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এসে দুইজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষনা করেন।

এছাড়া ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শহরের পিটিআই সড়কে সরকারি সিটি কলেজের সামনে জেলখানা মোড়ে কয়েকজন তরুণের মধ্যে বাকবিন্ডা হয়। এসময় একজন ধারালো ছুরি দিয়ে পলাশ সহদুইজনকে আঘাত করে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে পলাশ মারা যান।

সম্প্রতি কুষ্টিয়া শহর এলাকায় বিভিন্ন অঞ্চল ও গ্রুপ ভিত্তিক অন্তত: ২২টি কিশোর গ্যাং দোর্দন্ড প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরজুড়ে। তারা বাসা থেকে বেড়িয়ে অভিভাবকদের দৃষ্টি এড়িয়ে মাদক সেবনসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে মনে করেন সচেতন মহল। কিশোর গ্যাং দের অত্যাচারে শহরের বাইরে থেকে যারা এসে শহরে পড়াশোনা করে এমন শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ম্যাসে থাকা শিক্ষার্থীদের গ্রুপিং না করলে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে।

শহরের ম্যাসে থাকা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের মেসে চুরি এখন নিয়মিত ঘটনা, আমরা বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে এসেছি চোর দেখতে পেলেও ভয়ে কিছু বলতে পারি না, কারণ ওরা বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।

তবে কুষ্টিয়ায় কিশোর অপরাধীদের ধরতে এবং আইনের আওতায় আনতে কাজ করে যাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে অদৃশ্য কারণে কিশোর অপরাধের শীর্ষ অবস্থান থেকে যারা নেতৃত্ব দেন তাদের কিছুই হয় না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দেয় তারা। এদিকে কুষ্টিয়া কোর্টের দেওয়া বিভিন্ন মামলার রায়েও জেলার কিশোর অপরাধীদের সত্যতা উঠে এসেছে। ৪ জুন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া কাজীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেনীর ছাত্রী জয়া খাতুনকে পালাক্রমে ধর্ষণের পরে হত্যার ঘটনায় লিমন (১৭), সাহিল (১৭) এবং হিমেল (১৭) নামের তিন কিশোরকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

২৩ আগষ্ট রোববার এ ঘটনায় কুষ্টিয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতের বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এর এজলাসে সৌপর্দ করা হলে তাদের কিসোর সেলে প্রেরণের নির্দেশ দেন আদালত। যা পরে বিচারিক হাকিমের আদালতে ১৬৪ধারা জবানবন্দীতেও স্বীকার করে ঐ কিশোররা।

২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতের বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান একটি ধর্ষণ মামলায় ধর্ষক কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর গ্রামের কৌতুক শেখের ছেলে সাদ্দাম হোসেন অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় ১০বছরসহ ১লক্ষ টাকা জরিমানা করেন। এ মামলায় সহায়তা কারীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন তিনি।

গোয়েন্দা শাখার একটি সুত্র মতে, কুষ্টিয়া শহর জুড়ে প্রায় ১১টির কিশোর গ্যাং রয়েছে। যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। কুষ্টিয়ায় বর্তমানে “ব্যাড বয়েজ”, “০০৭”, “বিএসবি গ্রুপ” সহ বড় চারটি গ্রুপ রয়েছে, যাদের সদস্য সংখ্যা অর্ধশত। শহরের থানাপাড়া, কালিশংকরপুর, কোর্টপাড়া, কুঠিপাড়ায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং তাদের নানা অপকর্ম চালাচ্ছে। এগুলো বেশিরভাগই কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দাপটে চলে।

কুষ্টিয়ার হরিপুর এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানায়, “কিশোর গ্যাং ইদানিং খুবই বে-পরোয়া হয়ে গেছে। বিশেষ করে তাদের ক্ষমতা ও লোকবল দেখাতে শেখ রাসেল হরিপুর-কুষ্টিয়া সংযোগ সেতুর উপরে দলে দলে মোটরসাইকেল নিয়ে বে-পরোয়া ভাবে চলাচল করে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। সেই সাথে তারা নদীর ধারে বসায় মাদকের আসর।”

কুষ্টিয়ার শিশু অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বরত প্রবেশন অফিসার আরিফুল ইসলাম জানান, অভিভাবকদের নজরদারীর অভাবে অধিকাংশ কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কুষ্টিয়ায় বর্তমানে সংঘটিত অন্তত ৪০টি শিশু-কিশোর অপরাধের ঘটনায় জড়িত শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করছি। অপরাধ সংঘটনের পর শিশু সুরক্ষা আইনের বিধিমতে, অভিভাবকদের সাথে সমন্বিত উদ্যোগে প্রদত্ত নির্দেশিকার আলোকে তাদের আইনী সহায়তাসহ সব রকম নার্সিং করা হচ্ছে বলেও জানায় এই কর্মকর্তা।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের নেতা কারশেদ আলম জানান, “দিন দিন অভিভাবকদের দায়িত্বে অবহেলা, ব্যস্ততার কারণে ঠিকমতো বাচ্চাদের সময় না দেওয়ার ফলে অধিকাংশ কিশোররা বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। আমাদের উচিৎ আমাদের ছেলে মেয়েরা কখন কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে মিশছে, কি করছে এগুলোর দিকে লক্ষ রাখা।

বর্তমানে কুষ্টিয়ার কিশোর অপরাধ প্রবণতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব নিয়ে আমরা সচেতন নাগরিক সমাজ বেশ চিন্তিত। কারণ এসব কিশোরদের হাতে এখন আধুনিক প্রযুক্তি, কলম এর পরিবর্তে মাদক, চাকু চলে আসছে। এগুলো বন্ধ না হলে আগামীতে সমাজে ভয়াবহ অবক্ষয় হতে পারে।”

কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুস্তাফিজুর রহমান জানান, “কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে অনেকটা অভিভাবকদের উদাসীনতা দায়ি। পুলিশের কাজ অপরাধিকে আইনের আওতায় আনা। কিন্তু কিশোরদের অপরাধী তৈরী হয়ে উঠার আগেই পারিবারিকভাবে তা দমন করা যায়।”

তিনি বলেন, “কিশোরদের প্রতি সবাইকে সহনশীল হতে হবে। শিশু-কিশোরদের প্রতি অভিভাবকদের দায়িত্ব বেশি। স্কুল গামী শিশু ও কিশোরদের দিকে অভিভাবকদের যথাযথ নজর দিলে কিশোর অপরাধ দমন করা সম্ভব হবে।”


এ জাতীয় আরো খবর ....

Archives

MonTueWedThuFriSatSun
   1234
12131415161718
19202122232425
2627282930  
       
293031    
       
891011121314
15161718192021
       
       
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
       
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
30      
   1234
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930    
       
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
31      
এক ক্লিকে বিভাগের খবর
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect. Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.